পাহাড়পুর ও মহাস্থানগড় ভ্রমণ: প্রাচীন বাংলার দুই বিস্ময়, ২ দিনের প্ল্যান
আড়াই হাজার বছরের পুরনো পুণ্ড্রনগর আর বারোশো বছরের সোমপুর মহাবিহার। বগুড়া ও নওগাঁয় দুই প্রত্নস্থান কীভাবে এক ট্রিপে দেখবেন, ইতিহাস, জাদুঘর, বেহুলার বাসরঘর, কুসুম্বা মসজিদ, বগুড়ার দই আর খরচ।

- ঢাকা থেকে বগুড়া
- প্রায় ২০০ কিমি, বাসে ৪–৫ ঘণ্টা
- বগুড়া থেকে মহাস্থানগড়
- প্রায় ১৩ কিমি
- বগুড়া থেকে পাহাড়পুর
- জয়পুরহাট হয়ে প্রায় ২ ঘণ্টা
- কত দিন
- ২ দিন
- সাপ্তাহিক বন্ধ
- প্রত্নস্থানের জাদুঘর সাধারণত রবিবার
ট্রিপ টিকেট
বাংলাদেশের ইতিহাস যে কত পুরনো, তা নিজের চোখে দেখতে চাইলে উত্তরবঙ্গের দুটি জায়গায় যেতেই হবে। বগুড়ার মহাস্থানগড়ে আছে খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের পুণ্ড্রনগরের প্রাচীর, দেশের প্রাচীনতম নগরের ধ্বংসাবশেষ। আর নওগাঁর পাহাড়পুরে অষ্টম শতকের সোমপুর মহাবিহার, হিমালয়ের দক্ষিণে সবচেয়ে বড় বৌদ্ধ বিহার আর ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য স্থান। দুটোই এক ট্রিপে, দুই দিনে দেখা যায়।
মহাস্থানগড়: দেশের প্রাচীনতম নগর
ইতিহাস
মহাস্থানগড় করতোয়া নদীর তীরে প্রাচীন পুণ্ড্রনগরের ধ্বংসাবশেষ, যা পুণ্ড্রবর্ধন অঞ্চলের রাজধানী ছিল। এখানে পাওয়া ব্রাহ্মী লিপির শিলালিপি থেকে ধারণা করা হয়, অন্তত খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে এখানে সমৃদ্ধ নগর ছিল। মৌর্য, গুপ্ত, পাল আর পরে সুলতানি আমল পর্যন্ত বহু শতাব্দী ধরে মানুষ এখানে বাস করেছে।
যা দেখবেন
- দুর্গপ্রাচীর: আয়তাকার উঁচু মাটির ঢিবি আর ইটের দেয়াল, যার ওপর দিয়ে হাঁটা যায়।
- শাহ সুলতান বলখী (রহ.)-এর মাজার: দুর্গের উঁচু ঢিবির ওপর।
- মহাস্থানগড় জাদুঘর: খননে পাওয়া মুদ্রা, পোড়ামাটির ফলক, মূর্তি আর অলংকার।
- বেহুলার বাসরঘর (গোকুল মেধ): প্রায় ২ কিলোমিটার দূরে ধাপে ধাপে উঠে যাওয়া প্রাচীন ইটের স্থাপনা, বেহুলা-লখিন্দরের লোককথার সাথে জড়িত।
- ভাসু বিহার ও অন্য ঢিবি: আশেপাশে আরও কয়েকটি প্রত্নস্থান।

যাওয়ার উপায়
বগুড়া শহর থেকে রংপুর রোড ধরে প্রায় ১৩ কিলোমিটার। বাস, সিএনজি বা অটোতে আধা ঘণ্টা। মহাস্থান বাজারে নেমে হেঁটে দুর্গে, তারপর সিএনজিতে জাদুঘর আর গোকুল মেধ।

পাহাড়পুর: সোমপুর মহাবিহার
ইতিহাস
পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার বা সোমপুর মহাবিহার অষ্টম শতকের শেষ দিকে পাল রাজা ধর্মপাল তৈরি করেন বলে ধারণা করা হয়। এটা ছিল শিক্ষা আর ধর্মচর্চার বড় কেন্দ্র, দূর দেশ থেকেও ভিক্ষুরা আসতেন। মাঝখানে বিশাল ক্রুশাকার মন্দির, আর চারপাশে বর্গাকার দেয়ালের গায়ে ভিক্ষুদের শতাধিক কক্ষ। ১৯৮৫ সালে এটি ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য স্থানের তালিকায় ওঠে।
যা দেখবেন
- কেন্দ্রীয় মন্দির: ধাপে ধাপে উঠে যাওয়া ইটের বিশাল কাঠামো; দূর থেকে পাহাড়ের মতো দেখায়, তাই নাম পাহাড়পুর।
- পোড়ামাটির ফলক: মন্দিরের দেয়ালে সারি সারি টেরাকোটা ফলক, যাতে মানুষ, পশু আর লোকজীবনের ছবি।
- ভিক্ষুদের কক্ষ: চারপাশের দেয়াল ধরে হাঁটলে পুরো বিহারের আকার বোঝা যায়।
- পাহাড়পুর জাদুঘর: খননে পাওয়া মূর্তি, মুদ্রা আর ফলক।
- সত্যপীর ভিটা ও গন্ধেশ্বরী মন্দির: বিহারের কাছে আরও দুটি প্রত্নস্থান।

যাওয়ার উপায়
পাহাড়পুর নওগাঁর বদলগাছী উপজেলায়, জয়পুরহাট থেকে কাছে। বগুড়া থেকে বাসে জয়পুরহাট (দেড় ঘণ্টার মতো), সেখান থেকে সিএনজিতে পাহাড়পুর। নওগাঁ শহর থেকেও সিএনজিতে যাওয়া যায়। ট্রেনে গেলে সবচেয়ে কাছের স্টেশন জামালগঞ্জ।
এক ট্রিপে দুটো: ২ দিনের প্ল্যান
দিন ১: মহাস্থানগড়
- রাতের বাসে ঢাকা থেকে ভোরে বগুড়া, হোটেলে চেক-ইন আর নাস্তা
- সকাল ৯টা: মহাস্থানগড়ের দুর্গপ্রাচীর আর শাহ সুলতান বলখী (রহ.)-এর মাজার
- সকাল ১১টা: মহাস্থানগড় জাদুঘর
- দুপুর: বেহুলার বাসরঘর, তারপর মহাস্থানের কটকটি
- বিকেল: বগুড়া শহরে নওয়াব প্যালেস, সন্ধ্যায় বগুড়ার দই
দিন ২: পাহাড়পুর
- সকাল ৭টা: বাসে জয়পুরহাট, তারপর সিএনজিতে পাহাড়পুর
- সকাল ১০টা: সোমপুর মহাবিহার আর জাদুঘর (২–৩ ঘণ্টা)
- দুপুর: চাইলে নওগাঁর দিকে কুসুম্বা মসজিদ (১৫৫৮ সালের কালো পাথরের মসজিদ, পাঁচ টাকার নোটে যার ছবি)
- বিকেল-রাত: বগুড়া বা নওগাঁ থেকে ঢাকার বাস
আশেপাশে আরও
- খেরুয়া মসজিদ: বগুড়ার শেরপুরে ১৫৮২ সালের তিন গম্বুজ মসজিদ।
- দিবর দিঘি: নওগাঁয় দিঘির মাঝখানে একাদশ শতকের স্তম্ভ, কৈবর্ত বিদ্রোহের স্মৃতি।
- পতিসর কুঠিবাড়ি: নওগাঁর আত্রাইয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জমিদারি কাছারিবাড়ি।
- আলতাদিঘি জাতীয় উদ্যান: শালবনে ঘেরা বিশাল দিঘি।
কোথায় থাকবেন
বগুড়া শহরে থাকাই সবচেয়ে সুবিধাজনক: মম ইন (বিলাসবহুল রিসোর্ট), নাজ গার্ডেন, পর্যটন মোটেলসহ নানা মানের হোটেল, ভাড়া ৳১,২০০–৫,০০০। পাহাড়পুরে পর্যটনের রেস্ট হাউস আছে, আগে থেকে খোঁজ নিন।
কী খাবেন
- বগুড়ার দই: দেশের সবচেয়ে বিখ্যাত দই; আকবরিয়া, রফাত, এশিয়ার মতো পুরনো দোকানে
- মহাস্থানের কটকটি: গুড়ে ভাজা শক্ত মিষ্টি, মহাস্থান বাজারে
- নওগাঁর প্যারা সন্দেশ
খরচের হিসাব
২ দিন, জনপ্রতি, ২–৪ জনের দলে:
| খাত | আনুমানিক খরচ |
|---|---|
| ঢাকা-বগুড়া বাস (আসা-যাওয়া) | ১,০০০–২,৬০০৳ |
| এক রাত হোটেল (ভাগাভাগি) | ৬০০–২,০০০৳ |
| স্থানীয় যাতায়াত (মহাস্থান, জয়পুরহাট, পাহাড়পুর) | ৫০০–১,০০০৳ |
| খাওয়া (২ দিন) | ৮০০–১,৫০০৳ |
| প্রবেশ ফি (দুই জায়গা ও জাদুঘর) | ১০০–৩০০৳ (বিদেশিদের বেশি) |
| মোট | ৩,০০০–৭,৪০০৳ |
কিছু টিপস
- দুই জায়গাই খোলা প্রান্তর; টুপি, পানি আর আরামদায়ক জুতা নিন
- পোড়ামাটির ফলক বা দেয়ালে হাত দেবেন না, ওপরে উঠবেন না
- স্থানীয় গাইড নিলে ইতিহাস অনেক বেশি জীবন্ত হয়ে ওঠে
- শীতকাল (নভেম্বর–ফেব্রুয়ারি) সবচেয়ে আরামদায়ক; গরমে দুপুরে ছায়া খুব কম
বিস্তারিত দেখুন বগুড়া আর নওগাঁ জেলার গাইডে। আর রাজশাহী শহর আর পুঠিয়া নিয়ে পড়ুন রাজশাহী ভ্রমণ গাইড।
প্রশ্নোত্তর
পাহাড়পুর কোন জেলায়?
পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার নওগাঁ জেলার বদলগাছী উপজেলায়, জয়পুরহাট শহর থেকে কাছে।
মহাস্থানগড় কত পুরনো?
এখানে পাওয়া শিলালিপি থেকে ধারণা করা হয়, অন্তত খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে এখানে নগর ছিল, তাই এটি দেশের প্রাচীনতম নগরের ধ্বংসাবশেষ।
পাহাড়পুর আর মহাস্থানগড় কি এক দিনে দেখা যায়?
খুব ভোরে শুরু করলে সম্ভব, কিন্তু তাড়াহুড়ো হবে। দুই দিন রাখলে জাদুঘরসহ আরামে দেখা যায়।
পাহাড়পুর ও মহাস্থানগড় কবে বন্ধ থাকে?
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের স্থানগুলো সাধারণত রবিবার বন্ধ, সোমবার দুপুরের পর খোলে। সময় বদলাতে পারে, তাই যাওয়ার আগে দেখে নিন।
ঢাকা থেকে পাহাড়পুর কীভাবে যাব?
বাসে বগুড়া বা জয়পুরহাট, তারপর সিএনজিতে পাহাড়পুর। ট্রেনে গেলে জামালগঞ্জ স্টেশন সবচেয়ে কাছে।
ম্যাপে দেখুন, প্ল্যান করুন
জায়গাগুলোর বিস্তারিত, যাওয়ার উপায় আর খরচ দেখুন, আর নিজের ট্রিপ সাজান।


