আলপনা গ্রাম টিকইল: চাঁপাইনবাবগঞ্জের রঙিন মাটির ঘর, দেখন বর্মণ আর যাওয়ার উপায়
খাতা-কলমে নাম টিকইল, মানুষ চেনে আলপনা গ্রাম নামে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলের এই গ্রামে মাটির ঘরের দেয়াল জুড়ে ফুল, পাখি আর লতাপাতা। দেখন বর্মণের হাতে কীভাবে শুরু, রং আসে কোথা থেকে, কখন গেলে সবচেয়ে সুন্দর দেখবেন আর কীভাবে যাবেন। সঙ্গে আমাদের নতুন ভিডিও।

- কোথায়
- টিকইল, নেজামপুর ইউনিয়ন, নাচোল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ
- পরিচিতি
- আলপনা গ্রাম
- কারা আঁকেন
- মূলত গ্রামের নারী ও মেয়েরা
- সেরা সময়
- শীত; আর দুর্গাপূজা, লক্ষ্মীপূজা ও পহেলা বৈশাখের পরে, যখন রং নতুন
- থাকা
- চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে
ট্রিপ টিকেট
বরেন্দ্রের লাল মাটির পথ ধরে নাচোলের দিকে এগোলে একটা গ্রামে হঠাৎ রং বদলে যায়। মাটির ঘরের দেয়াল জুড়ে ফুল, পাখি, লতাপাতা, কোথাও নৌকা, কোথাও কবির মুখ। খাতা-কলমে গ্রামের নাম টিকইল, কিন্তু চাঁপাইনবাবগঞ্জের মানুষ, আর এখন সারা দেশের মানুষ, একে চেনে "আলপনা গ্রাম" নামে।
এই লেখায় টিকইলের গল্প: আলপনার পুরনো রীতি থেকে কীভাবে আজকের রঙিন গ্রাম হলো, রং আসে কোথা থেকে, কারা আঁকেন, আর আপনি গেলে কীভাবে যাবেন ও কী মনে রাখবেন।

টিকইল কোথায়
টিকইল চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাচোল উপজেলার নেজামপুর ইউনিয়নের একটি গ্রাম। জেলা শহর থেকে উত্তর-পূর্বে, হাটবাকইল বাজারের উত্তর দিকে। এই অঞ্চল বরেন্দ্রভূমির অংশ, লাল আর এঁটেল মাটির দেশ, আর এখানকার পুরনো বাড়িগুলোও সেই মাটি দিয়েই তৈরি।

নাচোল নামটা অনেকের চেনা অন্য কারণেও: ১৯৫০ সালের নাচোল কৃষক আন্দোলন আর তার নেত্রী ইলা মিত্র। টিকইলের দেয়ালেও তাঁর প্রতিকৃতি আঁকা আছে।
আলপনার পুরনো রীতি
আলপনা বাংলার বহু পুরনো লোকশিল্প। টিকইলের হিন্দু পরিবারগুলো পূজা-পার্বণে মাটির দেয়ালে সাদা আর লাল রঙে ফোঁটা আর দাগ দিত, তুলসীতলা সাজাত। এটা কবে শুরু, কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারেন না; গ্রামের মানুষ বলেন, পূর্বপুরুষদের আমল থেকেই চলে আসছে। একসময় বিয়ের সম্বন্ধেও বাড়ির আলপনা দেখে মেয়ের হাতের গুণ বিচার করা হতো বলে শোনা যায়।

দেখন বর্মণ: যাঁর হাতে রঙিন হলো গ্রাম
প্রায় চার দশক আগে বারো বছর বয়সে বউ হয়ে টিকইলে আসেন দেখন বর্মণ (অনেক সংবাদে দেখন বালা বর্মণ)। শ্বশুরবাড়ির দেয়ালে সাদা-লালের সেই একই নকশা তাঁর একঘেয়ে লাগত। তিনি দেয়ালে আঁকলেন রংধনু, তারপর ফুল, গাছ আর পাখি। নিজের কথায়, বাড়িটাকে সুন্দর করে সাজানোর জন্যই আঁকা শুরু।
তাঁর বাড়ি দেখতে মানুষ আসতে লাগল, আর প্রতিবেশী নারীরা তাঁর কাছ থেকে শিখে নিজেদের ঘর রাঙাতে শুরু করলেন। তারপর তাঁদের মেয়েরা। এভাবেই এক বাড়ি থেকে পুরো গ্রামে ছড়িয়েছে রঙিন আলপনা। দেখন বর্মণের বাড়ি এখন গ্রামে "আলপনা বাড়ি" নামে পরিচিত, আর জেলা প্রশাসন তাঁকে আলপনার উদ্যোক্তা হিসেবে সনদ আর সম্মাননা দিয়েছে।


কোনো আর্ট স্কুল নেই এখানে। দাদি শেখান নাতনিকে, মা শেখান মেয়েকে। প্রায় সব কাজই নারীদের, যদিও এখন অনেক বাড়িতে ছেলেরাও হাত লাগায়।





রং আসে মাটি থেকে
আগে আলপনার সব রং বানানো হতো হাতের কাছের জিনিস দিয়ে:
- লাল: বরেন্দ্রের লাল মাটি পানিতে ধুয়ে তলানি থেকে, যাকে স্থানীয়ভাবে "আখির" বলে।
- সাদা: খড়িমাটি বা চকের গুঁড়া থেকে, অথবা আতপ চাল ভিজিয়ে বেটে।
- টেকসই করতে: আমের পুরনো আঁটির শাঁস, মানকচু আর কলাগাছের কষ, শুকনো বরই আর গিরিমাটি মিশিয়ে কয়েক দিন ভিজিয়ে রাখা হয়।
এই রং বৃষ্টিতে বেশিদিন টেকে না, তাই এখন অনেকে বাজারের রংও ব্যবহার করেন। তবে দেয়াল যে মাটির, সেটা বদলায়নি।

কীভাবে আঁকা হয়
প্রথমে দেয়াল এঁটেল মাটি দিয়ে মসৃণ করে লেপা হয়। শুকালে চক বা পেনসিলে নকশা আঁকা, তারপর রং। দেখন বর্মণের হিসেবে মাঝারি একটা দেয়ালেই লাগে প্রায় পনেরো দিন, সংসারের কাজের ফাঁকে করলে এক মাসও। বর্ষায় রং ফিকে হয়ে যায়, তাই বৃষ্টির আভাস পেলে অনেকে দেয়াল আর উঠোন পলিথিনে ঢেকে দেন। রং উঠে গেলে কখনো আবার রং করা হয়, কখনো একেবারে নতুন নকশা।

উৎসব আর দেয়ালের গল্প
দুর্গাপূজা, লক্ষ্মীপূজা, কালীপূজা, সরস্বতীপূজা, নবান্ন, পহেলা বৈশাখ আর বিয়ের আগে বাড়ি নতুন করে রাঙানো হয়। দুর্গাপূজায় কাজ শেষ করতে হয় ষষ্ঠীর আগেই। উঠোনে আলপনা, তুলসীতলায় নতুন নকশা।

দেয়ালে শুধু ফুল-পাখিই নয়। কোথাও নৌকা আর নদী, কোথাও গ্রামের জীবন, কোথাও মুক্তিযুদ্ধ। কোনো ঘরে রবীন্দ্রনাথ ("বিশ্বকবি") আর নজরুলের ("জাতীয় কবি") মুখ, কোনোটায় নাচোলের ইলা মিত্র।


এক গ্রাম, পাশাপাশি দুই সম্প্রদায়
টিকইলে হিন্দু আর মুসলিম পরিবার পাশাপাশি থাকে, একসঙ্গে মাঠে, হাটে, দোকানে কাজ করে। আলপনা মূলত হিন্দু বাড়ির ঐতিহ্য হলেও এখন পুরো গ্রামের গর্ব; কয়েকটি মুসলিম বাড়িতেও আলপনা আঁকা হয়েছে। দেশ-বিদেশ থেকে মানুষ আসে দেখতে, নবদম্পতিরা আসে ছবি তুলতে, সিনেমার শুটিংও হয়েছে। গ্রামের দাসু বর্মণের কাছে একটা খাতা আছে, যেখানে দর্শনার্থীরা তাঁদের মন্তব্য লিখে যান।

জেলা প্রশাসন গ্রামের রাস্তা সংস্কার করেছে আর সৌরবাতি বসিয়েছে, যাতে সন্ধ্যার পরেও আলপনা দেখা যায়।
জনপ্রিয় · আনসিন শপ৬৪ জেলার ম্যাপপ্রতিটি জেলার 3D রিলিফ ম্যাপ: নদী, দর্শনীয় স্থান, পাশের জেলা আর বিখ্যাত খাবার। বাংলা আর ইংরেজিতে ১২৮টি ম্যাপ।ম্যাপগুলো দেখুন →


বদলে যাচ্ছে মাটির ঘর
আলপনার আসল ক্যানভাস মাটির ঘর, আর সেই মাটির ঘর প্রতি বছর একটু একটু করে কমছে; উঠছে পাকা বাড়ি। দেখন বর্মণ নিজেও মানেন, একসময় হয়তো মাটির ঘর থাকবে না। তাঁর আশা, পাকা দেয়ালেও গ্রামের মেয়েরা আলপনা এঁকে ঐতিহ্য ধরে রাখবেন।

আমাদের ভিডিও
এই গ্রাম নিয়ে আমরা একটা ছোট ডকুমেন্টারি বানিয়েছি, দুই মিনিটের কম: টিকইলের আসল ছবি, দেখন বর্মণের গল্প, রং বানানোর উপকরণ আর আঁকার ধাপ। ছবিগুলো উইকিমিডিয়া কমন্সের, আলোকচিত্রী Rayhan Ahmed ও Shariful iea।

কীভাবে যাবেন
- ঢাকা থেকে: বাসে বা ট্রেনে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর, অথবা রাজশাহী হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ। ট্রেনের সময় আর ভাড়া দেখুন আমাদের ট্রেনের সময়সূচিতে।
- চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে: বাস বা সিএনজিতে নাচোলের দিকে, তারপর অটোরিকশায় হাটবাকইল বাজার হয়ে টিকইল। স্থানীয়ভাবে "আলপনা গ্রাম" বললেই সবাই চেনে।
- থাকা-খাওয়া: গ্রামে থাকার ব্যবস্থা নেই; চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে হোটেলে থেকে দিনে ঘুরে আসা সুবিধাজনক।
- কখন যাবেন: শীতে রং সবচেয়ে উজ্জ্বল থাকে, বর্ষায় ফিকে হয়ে যায়। পূজা বা পহেলা বৈশাখের পরপর গেলে নতুন আঁকা আলপনা দেখতে পাবেন।

- সঙ্গে ঘুরে আসুন: ছোট সোনা মসজিদ, তাহখানা আর দারাসবাড়ি মসজিদ। পুরো জেলার জন্য দেখুন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা গাইড।
তথ্যসূত্র: দ্য ডেইলি স্টার (২০১৬), ঢাকা টাইমস ও টিবিএস (২০১৯), সমকাল ও আরব নিউজ (২০২১), দ্য ডেইলি স্টার বাংলা (২০২১), দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস (২০২৩), প্রথম আলো (২০২৩) ও গারল্যান্ড ম্যাগাজিন (২০২৪)।
প্রশ্নোত্তর
আলপনা গ্রাম কোথায়?
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাচোল উপজেলার নেজামপুর ইউনিয়নে, গ্রামের নাম টিকইল। হাটবাকইল বাজারের উত্তরে।
টিকইলে আলপনা কে শুরু করেন?
পূজায় সাদা-লাল আলপনার রীতি অনেক পুরনো। আজকের রঙিন ফুল-পাখির আলপনা শুরু করেন দেখন বর্মণ, প্রায় চার দশক আগে বউ হয়ে গ্রামে আসার পর; তাঁর কাছ থেকে শিখে অন্য নারীরা নিজেদের ঘর রাঙান।
আলপনার রং কী দিয়ে তৈরি?
আগে লাল মাটি, খড়িমাটি, আতপ চালের গুঁড়া, আমের আঁটির শাঁস, মানকচু আর কলাগাছের কষ দিয়ে। এখন অনেকে বাজারের রংও ব্যবহার করেন।
টিকইলে কখন গেলে আলপনা সবচেয়ে সুন্দর দেখা যায়?
শীতে, আর দুর্গাপূজা, লক্ষ্মীপূজা বা পহেলা বৈশাখের পরপর, যখন বাড়িগুলো নতুন করে রাঙানো হয়। বর্ষায় রং ফিকে থাকে।
টিকইলে কি থাকার জায়গা আছে?
না, গ্রামে হোটেল নেই। চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে থেকে দিনে ঘুরে আসাই ভালো।
এই লেখার জায়গাগুলোর পূর্ণ গাইড
ম্যাপে দেখুন, প্ল্যান করুন
জায়গাগুলোর বিস্তারিত, যাওয়ার উপায় আর খরচ দেখুন, আর নিজের ট্রিপ সাজান।


