কাপড়ে বোনা বাংলাদেশ: আট বিভাগের আট বুনন আর তাদের ইতিহাস
রংপুরের শতরঞ্জি থেকে কুয়াকাটার রাখাইন তাঁত: বাংলাদেশের আট বিভাগের আটটি পরিচিত বুনন, প্রতিটির পেছনের ইতিহাস, কারা বোনেন, আর বেড়াতে গিয়ে কোথায় দেখবেন বা কিনবেন। সঙ্গে আমাদের নতুন ভিডিও আর কাপড়ে বোনা মানচিত্র।

- বিষয়
- আট বিভাগের আটটি হাতের বুনন ও সূচিকর্ম
- সবচেয়ে পুরনো গল্প
- রংপুরের শতরঞ্জি, কয়েকশো বছরের
- জিআই স্বীকৃতি
- শতরঞ্জি ও রাজশাহী সিল্ক
- ভিডিও
- প্রায় সাড়ে ৪ মিনিট, Unseen Bangladesh
- কেনার সেরা উপায়
- তাঁতিদের কাছ থেকে সরাসরি
ট্রিপ টিকেট
একটা দেশকে চেনার অনেক উপায় আছে: নদী দিয়ে, পাহাড় দিয়ে, খাবার দিয়ে। আমরা এবার বাংলাদেশকে চিনতে চেয়েছি কাপড় দিয়ে। এদেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলের নিজের একটা বুনন আছে, নিজের একটা নকশা, আর প্রতিটি সুতার পেছনে আছে বহু প্রজন্মের গল্প। সেই ভাবনা থেকেই বানানো হয়েছে "কাপড়ে বোনা বাংলাদেশ" মানচিত্র আর তার সঙ্গের ভিডিও, যেখানে আটটি বিভাগকে সাজানো হয়েছে তাদের সবচেয়ে পরিচিত বুননের নকশায়।
এই লেখায় ভিডিওর প্রতিটি অধ্যায় একটু বিস্তারিত: কোন কাপড় কোথায় জন্ম নিয়েছে, কেন, কারা এখনও বুনছেন, আর বেড়াতে গেলে আপনি কোথায় সেগুলো দেখতে বা কিনতে পারেন।

মানচিত্র আর ভিডিওটা কীভাবে বানানো
মানচিত্রের প্রতিটি বিভাগ ভরা হয়েছে একটা নকশা দিয়ে, যা সেই অঞ্চলের পরিচিত কাপড়ের আদলে কোডে আঁকা: রংপুরে শতরঞ্জির ডোরা, ময়মনসিংহে কাঁথার গোল ফোঁড়, সিলেটে মণিপুরী তাঁতের খাড়া রঙিন রেখা, রাজশাহীতে সিল্কের সোনালি আভা, ঢাকায় বেনারসির মেরুন জমিনে জরির ফুল, চট্টগ্রামে খাদির মোটা চেক, খুলনায় যশোর স্টিচের রঙিন ফুল আর বরিশালে রাখাইন তাঁতের উজ্জ্বল ডোরা।
ভিডিওতে ক্যামেরা এক বিভাগ থেকে আরেক বিভাগে উড়ে যায়, আর প্রতিটি বিভাগ যেন তাঁতের মাকুর টানে নতুন করে বোনা হয়। তার সঙ্গে আসল ছবি, মানচিত্রে জায়গার পিন, আর মণিপুর, বেনারস ও আরাকান থেকে মানুষের আসার পথ। ছবিগুলো উইকিমিডিয়া কমন্সের, প্রতিটির নিচে আলোকচিত্রীর নাম দেওয়া আছে।
রংপুর: শতরঞ্জি

রংপুর শহরের কাছে নিসবেতগঞ্জ নামে একটা গ্রাম আছে। এই গ্রামে কয়েকশো বছর ধরে বোনা হয় শতরঞ্জি, মানে মোটা সুতার হাতে বোনা মাদুর বা কার্পেট। গ্রামটির নামের পেছনেও গল্প আছে: ব্রিটিশ আমলে রংপুরের কালেক্টর নিসবেত এই শিল্পে উৎসাহ দিয়েছিলেন, তাঁর নামেই গ্রামের নাম হয় নিসবেতগঞ্জ।
শতরঞ্জি বুনতে কোনো যন্ত্র লাগে না। মাটিতে টানা সুতার ওপর হাত দিয়ে একটা একটা সারি করে নকশা তোলা হয়। তাই একই নকশার দুটি শতরঞ্জিও হুবহু এক হয় না। রংপুরের শতরঞ্জি এখন বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য, আর দেশের বাইরেও যায়।

- কোথায় দেখবেন: রংপুর শহর থেকে কাছেই নিসবেতগঞ্জ; শহরের শোরুমেও শতরঞ্জি পাওয়া যায়।
- সঙ্গে ঘুরে আসুন: তাজহাট জমিদারবাড়ি আর কারমাইকেল কলেজ।
ময়মনসিংহ: জামালপুরের নকশিকাঁথা

ময়মনসিংহ বিভাগের জামালপুর জেলা পরিচিত নকশিকাঁথার জন্য। একসময় গ্রামের মেয়েরা পুরনো শাড়ি স্তরে স্তরে জুড়ে কাঁথা বানাতেন, আর সেই কাঁথার ওপর সুঁই-সুতায় আঁকতেন ফুল, পাখি, নৌকা, নিজেদের জীবনের গল্প। এভাবেই সাধারণ কাঁথা হয়ে ওঠে নকশিকাঁথা।
কবি জসীমউদ্দীনের বিখ্যাত কাব্য "নকশী কাঁথার মাঠ" এই অঞ্চলের মানুষের গল্প নিয়েই লেখা; কাঁথা সেখানে ভালোবাসা আর বিরহের স্মৃতি ধরে রাখার জিনিস। আজ জামালপুরের হাজারো নারী এই সুঁই-সুতার কাজ করেই সংসার চালান।



- কোথায় দেখবেন: জামালপুর জেলা শহরে কাঁথা আর হাতের কাজের দোকান; ঢাকার কাছে সোনারগাঁয়ের লোকশিল্প জাদুঘরে পুরনো নকশিকাঁথার সংগ্রহ।
সিলেট: মণিপুরী তাঁত

আঠারো আর উনিশ শতকে যুদ্ধ আর অস্থিরতার কারণে মণিপুর থেকে অনেক পরিবার চলে আসে সিলেট অঞ্চলে। সঙ্গে আনে তাদের ভাষা, নাচ, আর তাঁত। মণিপুরী মেয়েরা ঘরে বসে কোমর তাঁতে বোনেন শাড়ি, চাদর আর ওড়না। উজ্জ্বল রং আর জ্যামিতিক নকশা দেখলেই চেনা যায় এটা মণিপুরী কাপড়।

- কোথায় দেখবেন: মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের মণিপুরী পাড়ায় আজও ঘরে ঘরে তাঁতের খটখট শব্দ শোনা যায়; শ্রীমঙ্গলেও মণিপুরী কাপড়ের দোকান আছে।
- সঙ্গে ঘুরে আসুন: লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান আর মাধবপুর লেক; পুরো পরিকল্পনা পাবেন শ্রীমঙ্গল ভ্রমণ গাইডে।
রাজশাহী: রাজশাহী সিল্ক

বরেন্দ্র অঞ্চলে তুঁত গাছের চাষ আর রেশম পোকা পালনের ইতিহাস অনেক পুরনো। রেশম পোকা তুঁত পাতা খেয়ে গুটি বাঁধে, আর সেই গুটি থেকেই বের হয় সূক্ষ্ম রেশম সুতা। এই সুতায় বোনা নরম, উজ্জ্বল কাপড়টাই রাজশাহী সিল্ক।
- তুঁত পাতা: রেশম পোকার একমাত্র খাবার।
- রেশম পোকা: কয়েক সপ্তাহ পাতা খেয়ে নিজের চারপাশে গুটি বাঁধে।
- গুটি: গরম পানিতে ছাড়িয়ে এক একটি গুটি থেকে লম্বা সুতা টানা হয়।
- রেশম সুতা: সেই সুতা থেকে তাঁতে বোনা হয় শাড়ি, থান আর ওড়না।

দেশের রেশম বোর্ডের প্রধান কার্যালয়ও রাজশাহীতে। রাজশাহী সিল্কও এখন জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে।


- কোথায় দেখবেন: রাজশাহী শহরের সপুরা এলাকায় সিল্কের কারখানা আর শোরুম; অনেক কারখানায় বোনা হতে দেখা যায়।
- সঙ্গে ঘুরে আসুন: বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর আর পুঠিয়া মন্দির; দুই দিনের পরিকল্পনা আছে রাজশাহী ভ্রমণ গাইডে।
ঢাকা: মিরপুরের বেনারসি

উনিশশো সাতচল্লিশ সালের দেশভাগের পর ভারতের বেনারস থেকে অনেক তাঁতি পরিবার চলে আসে ঢাকায়। তারা বসতি গড়ে মিরপুরে, আর সঙ্গে নিয়ে আসে বেনারসি শাড়ি বোনার কৌশল। সেখান থেকেই জন্ম নেয় মিরপুর বেনারসি পল্লী। সোনালি জরি আর সূক্ষ্ম নকশার এই শাড়ি এখনও বাংলাদেশের অনেক কনের বিয়ের দিনের প্রথম পছন্দ।
- কোথায় দেখবেন: মিরপুরের বেনারসি পল্লীতে সারি সারি দোকান; বিয়ের মৌসুমে ভিড় বেশি থাকে, তাই সকালের দিকে যাওয়াই ভালো।
চট্টগ্রাম: কুমিল্লার খাদি

বিশ শতকের শুরুতে স্বদেশি আন্দোলনের সময় বিদেশি কাপড় বর্জনের ডাক ওঠে। মানুষ চরকায় নিজের হাতে সুতা কাটতে শুরু করে, আর সেই সুতায় বোনা কাপড়ের নাম খাদি। উনিশশো একুশ সালে কুমিল্লায় প্রতিষ্ঠিত অভয় আশ্রম এই খাদি ছড়িয়ে দিতে বড় ভূমিকা রাখে। সেই থেকে খাদি মানেই কুমিল্লা। মোটা, আরামদায়ক এই কাপড় আজও শীতের চাদর আর পাঞ্জাবিতে সমান জনপ্রিয়।

- কোথায় দেখবেন: কুমিল্লা শহরের কান্দিরপাড়ে খাদির দোকানের সারি।
- সঙ্গে ঘুরে আসুন: ময়নামতি, শালবন বিহার আর ধর্মসাগর।
খুলনা: যশোর স্টিচ

যশোর স্টিচ হলো এক ধরনের হাতের সূচিকর্ম। শাড়ি, পাঞ্জাবি আর থ্রি-পিসের ওপর ঘন, রঙিন ফোঁড়ে ফুল আর লতাপাতার নকশা তোলা হয়। এই কাজ গড়ে উঠেছে যশোরের গ্রামের নারীদের হাতে। ঘরের কাজের ফাঁকে বসে করা এই সূচিকর্ম আজ অনেক পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস।
- কোথায় দেখবেন: যশোর শহরের দোকানে আর মেলায়; গ্রামে গেলে উঠোনে বসে সূচিকর্ম করতে দেখা যায়।
- সঙ্গে ঘুরে আসুন: সাগরদাঁড়ি, মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্মস্থান, আর চাঁচড়া শিবমন্দির।
বরিশাল: কুয়াকাটার রাখাইন তাঁত

আঠারো শতকের শেষ দিকে আরাকান থেকে আসা রাখাইন জনগোষ্ঠী বসতি গড়ে পটুয়াখালী আর বরগুনার উপকূলে। রাখাইন মেয়েরা হাতের তাঁতে বোনেন লুঙ্গি, চাদর, গামছা আর ব্যাগ। উজ্জ্বল ডোরাকাটা নকশার এই কাপড় কুয়াকাটার বাজারে গেলেই চোখে পড়ে।


- কোথায় দেখবেন: কুয়াকাটা সৈকতের কাছে রাখাইন বাজার আর আশেপাশের রাখাইন পাড়া; মিশ্রিপাড়া বৌদ্ধ মন্দির যাওয়ার পথেও তাঁত চোখে পড়ে। পুরো পরিকল্পনা: কুয়াকাটা ভ্রমণ গাইড।
তাঁতিদের পাশে থাকুন
রংপুরের শতরঞ্জি থেকে কুয়াকাটার রাখাইন তাঁত, এই কাপড়গুলো টিকে আছে কিছু মানুষের হাতের যত্নে। কারখানার সস্তা কাপড়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অনেক তাঁতি পরিবার পেশা বদলাচ্ছে। তাই পরেরবার কোথাও বেড়াতে গেলে সেখানকার তাঁতিদের কাছ থেকে অন্তত একটা কিছু কিনে আনবেন। এই শিল্পগুলো বাঁচিয়ে রাখার এটাই সবচেয়ে সহজ উপায়।

আট বিভাগে আটটি বুনন বেছে নিতে গিয়ে অনেক কাপড় বাদ পড়েছে: টাঙ্গাইলের শাড়ি, নারায়ণগঞ্জের জামদানি, পাহাড়ের বম আর চাকমাদের তাঁত, আরও কত কী। আপনার এলাকার কোন কাপড়টা এই তালিকায় থাকা উচিত ছিল? আমাদের ফেসবুক পেজে জানান।
প্রশ্নোত্তর
বাংলাদেশের কোন কোন তাঁত ও বুনন জিআই স্বীকৃতি পেয়েছে?
এই লেখার আটটির মধ্যে রংপুরের শতরঞ্জি আর রাজশাহী সিল্ক জিআই পণ্য। এর বাইরে জামদানি আর টাঙ্গাইল শাড়িও জিআই তালিকায় আছে।
শতরঞ্জি কোথায় কিনব?
রংপুর শহরের কাছে নিসবেতগঞ্জ গ্রামে তাঁতিদের কাছ থেকে, অথবা রংপুর শহরের শোরুম থেকে। ঢাকার বড় হস্তশিল্পের দোকানেও পাওয়া যায়।
মিরপুর বেনারসি পল্লী কোথায়?
ঢাকার মিরপুরে। দেশভাগের পর বেনারস থেকে আসা তাঁতি পরিবারেরা এখানে বসতি গড়েছিলেন, তাই এর নাম বেনারসি পল্লী।
খাদি কেন কুমিল্লার সঙ্গে জড়িত?
স্বদেশি আন্দোলনের সময় ১৯২১ সালে কুমিল্লায় অভয় আশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয়, যা চরকায় কাটা সুতার খাদি ছড়িয়ে দিতে বড় ভূমিকা রাখে। সেই থেকে কুমিল্লা খাদির জন্য পরিচিত।
মণিপুরী তাঁতের কাপড় কোথায় পাওয়া যায়?
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের মণিপুরী পাড়ায় আর শ্রীমঙ্গলের দোকানে। অনেক পরিবার ঘরের তাঁতেই কাপড় বোনেন।
ম্যাপে দেখুন, প্ল্যান করুন
জায়গাগুলোর বিস্তারিত, যাওয়ার উপায় আর খরচ দেখুন, আর নিজের ট্রিপ সাজান।




