ভ্রমণ গাইড

সেন্টমার্টিন ভ্রমণ গাইড: সরকারি নিয়ম, জাহাজ, নিবন্ধন, খরচ ও ছেঁড়াদ্বীপ

দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপে যাওয়ার আগে যা জানা জরুরি। কোন মাসে যাওয়া যায় আর কখন রাতে থাকা যায়, অনলাইন নিবন্ধন ও ট্রাভেল পাস, কক্সবাজার থেকে জাহাজ, দ্বীপে কী করবেন আর কী নিষেধ, খরচ আর প্রবাল রক্ষার নিয়ম।

Unseen Bangladesh ডেস্ক২২ অক্টোবর ২০২৬ · ৮ মিনিটে পড়া English
সেন্টমার্টিন ভ্রমণ গাইড: সরকারি নিয়ম, জাহাজ, নিবন্ধন, খরচ ও ছেঁড়াদ্বীপ
ছবি: Crysis Rubel, cropped by JamesA, CC BY 2.0

ট্রিপ টিকেট

কোথায়
বঙ্গোপসাগরে, টেকনাফের দক্ষিণে; কক্সবাজার জেলা
পর্যটন মৌসুম
সাধারণত নভেম্বর–জানুয়ারি (সরকারি নিয়মে)
যাওয়ার পথ
কক্সবাজার থেকে জাহাজে ৬–৮ ঘণ্টা
নিবন্ধন
অনলাইনে, প্রতিদিন পর্যটকের সংখ্যা সীমিত
নিষেধ
রাতে সৈকতে আলো-শব্দ, বারবিকিউ, প্লাস্টিক, প্রবাল তোলা

নীল পানি, সারি সারি নারিকেল গাছ, সৈকতে ছড়ানো প্রবাল আর রাতের আকাশে অগুনতি তারা। সেন্টমার্টিন দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ, আর অনেকের কাছে বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর জায়গা। কিন্তু অতিরিক্ত পর্যটন আর দূষণে দ্বীপের প্রবাল ও প্রাণবৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ায় সরকার এখন পর্যটকদের যাওয়া কড়াভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। তাই সেন্টমার্টিন এখন আর যখন-তখন যাওয়ার জায়গা নয়। এই গাইডে নিয়ম, নিবন্ধন, যাতায়াত আর খরচ পরিষ্কার করে বলা হলো।

সেন্টমার্টিন সম্পর্কে কিছু কথা

সেন্টমার্টিন বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্ব অংশে, টেকনাফ উপকূল থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দক্ষিণে, কক্সবাজার জেলায়। স্থানীয়ভাবে এর নাম নারিকেল জিঞ্জিরা, নারিকেল গাছের প্রাচুর্যের জন্য। দ্বীপটা ছোট, প্রায় আট বর্গকিলোমিটার; হেঁটে বা সাইকেলে পুরোটা ঘোরা যায়।

দ্বীপের চারপাশের পানিতে প্রবাল, নানা রঙের মাছ, সামুদ্রিক কচ্ছপ আর শৈবাল আছে। সামুদ্রিক কচ্ছপ এখানকার সৈকতে ডিম পাড়তে আসে। এই কারণেই দ্বীপটা পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষিত, আর পর্যটন নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।

কখন যাওয়া যায়: সরকারি নিয়ম

২০২৪ সালের শেষ থেকে চালু হওয়া নিয়ম অনুযায়ী সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের যাওয়া এভাবে সীমিত করা হয়েছিল:

মাসনিয়ম (আগের মৌসুম অনুযায়ী)
নভেম্বরযাওয়া যায়, তবে শুধু দিনে; রাতে দ্বীপে থাকা যায় না
ডিসেম্বর–জানুয়ারিযাওয়া ও রাতে থাকা যায়
ফেব্রুয়ারি–অক্টোবরপর্যটকদের যাওয়া বন্ধ

এর সাথে প্রতিদিন দ্বীপে যাওয়া পর্যটকের সংখ্যাও সীমিত রাখা হয়, আগের মৌসুমগুলোয় দিনে প্রায় দুই হাজার জন। এ বছরের মাস, সংখ্যা আর শর্ত যাওয়ার আগে মিলিয়ে নিন।

নিবন্ধন আর ট্রাভেল পাস

সেন্টমার্টিন যেতে অনলাইনে নিবন্ধন করতে হয়। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের নির্ধারিত ওয়েবসাইট বা অ্যাপে নিবন্ধন করলে কিউআর কোডসহ ট্রাভেল পাস পাওয়া যায়, আর জাহাজের টিকিটও সেই ব্যবস্থার সাথে যুক্ত থাকে।

  1. সরকারি ঘোষণা থেকে নিবন্ধনের সঠিক ওয়েবসাইট জেনে নিন; ফেসবুক পেজ বা দালালের লিংকে টাকা দেবেন না।
  2. যাত্রীদের নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম নিবন্ধনের তথ্য দিয়ে নিবন্ধন করুন।
  3. জাহাজের টিকিট আর তারিখ নিশ্চিত করে ট্রাভেল পাস ডাউনলোড বা প্রিন্ট করুন।
  4. জাহাজে ওঠার সময় আর দ্বীপে নামার সময় পাস আর পরিচয়পত্র দেখাতে হয়।

কীভাবে যাবেন

প্রথমে কক্সবাজার

ঢাকা থেকে বাসে ৮–১০ ঘণ্টা, ট্রেনে কক্সবাজার এক্সপ্রেস বা পর্যটক এক্সপ্রেসে, অথবা বিমানে এক ঘণ্টায় কক্সবাজার। বিস্তারিত আছে আমাদের কক্সবাজার জেলার গাইডে।

কক্সবাজার থেকে জাহাজে

আগের মৌসুমগুলোয় নিরাপত্তার কারণে টেকনাফ থেকে জাহাজ চলাচল বন্ধ ছিল, আর জাহাজ ছেড়েছে কক্সবাজার শহরের নুনিয়াছড়া (বিআইডব্লিউটিএ) ঘাট থেকে। জাহাজ সাধারণত সকালে ছাড়ে, সেন্টমার্টিন পৌঁছাতে ৬–৮ ঘণ্টা লাগে, আর দিনের ট্রিপে বিকেলে ফেরে।

জিনিসআনুমানিক
জাহাজের টিকিট (আসা-যাওয়া, জনপ্রতি)শ্রেণিভেদে ২,০০০–৫,০০০৳
যাত্রার সময় (একপথ)৬–৮ ঘণ্টা
দিনের ট্রিপে দ্বীপে সময়মাত্র কয়েক ঘণ্টা

দিনের ট্রিপে দ্বীপে খুব কম সময় পাওয়া যায়, তাই সম্ভব হলে রাতে থাকার মাসগুলোয় (ডিসেম্বর-জানুয়ারি) যান।

দ্বীপে যা করবেন

পশ্চিম সৈকতে সূর্যাস্ত

দ্বীপের পশ্চিম দিকের সৈকত প্রবাল আর পাথরে ভরা, আর সূর্য সোজা সমুদ্রে ডোবে। সূর্যাস্তের সময় সৈকতটা সবচেয়ে সুন্দর।

সাইকেলে দ্বীপ ঘোরা

দ্বীপে সাইকেল ভাড়া পাওয়া যায়। জেটি থেকে উত্তর সৈকত, পশ্চিম সৈকত হয়ে দক্ষিণের দিকে সাইকেলে বা হেঁটে ঘুরলে নারিকেল বাগান, জেলেপাড়া আর ধানখেতের মাঝে দ্বীপের আসল জীবন দেখা যায়।

ছেঁড়াদ্বীপ

সেন্টমার্টিনের দক্ষিণে মূল দ্বীপ থেকে বিচ্ছিন্ন ছোট্ট প্রবাল দ্বীপ, এর নাম ছেঁড়াদ্বীপ। ভাটার সময় অনেকে হেঁটে বা সাইকেলে যান, জোয়ারে নৌকা লাগে। ছেঁড়াদ্বীপ সবচেয়ে সংবেদনশীল এলাকা; এখানে যাওয়ার অনুমতি আর নিয়ম মৌসুমভেদে আলাদা হতে পারে, স্থানীয়ভাবে জেনে নিন। জোয়ারের সময় হিসাব না করে গেলে আটকে যাওয়ার ঝুঁকি আছে।

সেন্টমার্টিনের নারিকেল বাগান
সেন্টমার্টিনের নারিকেল বাগানছবি: Ismailim, CC BY-SA 4.0

রাতের আকাশ আর সামুদ্রিক খাবার

শহরের আলো থেকে দূরে সেন্টমার্টিনের রাতের আকাশ তারায় ভরা। রেস্তোরাঁয় তাজা কোরাল, রূপচাঁদা, লবস্টার, কাঁকড়া আর ডাব পাওয়া যায়। তবে সৈকতে বারবিকিউ আর আগুন জ্বালানো নিষেধ।

যা নিষেধ

প্রবাল আর সামুদ্রিক প্রাণী রক্ষায় এই নিয়মগুলো মানতে হয়:

  • রাতে সৈকতে আলো জ্বালানো, উচ্চস্বরে গান-বাজনা আর আতশবাজি নিষেধ (কচ্ছপ আর পাখির ক্ষতি হয়)
  • সৈকতে বারবিকিউ, আগুন জ্বালানো বা ক্যাম্পফায়ার নিষেধ
  • প্রবাল, শামুক, ঝিনুক, কচ্ছপ বা যেকোনো সামুদ্রিক প্রাণী ধরা, তোলা বা বিক্রি নিষেধ
  • একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিয়ে যাওয়া নিরুৎসাহিত বা নিষিদ্ধ; নিজের পানির বোতল নিন
  • সৈকতে মোটরচালিত যান চালানো নিষেধ
  • কচ্ছপের ডিম পাড়ার জায়গায় যাওয়া নিষেধ

নিয়ম ভাঙলে জরিমানার বিধান আছে। তবে নিয়মের চেয়েও বড় কথা, আমাদের একটাই প্রবাল দ্বীপ; তাকে রক্ষা করার দায়িত্ব প্রত্যেক পর্যটকের।

কোথায় থাকবেন (রাতে থাকার মাসগুলোয়)

দ্বীপে ছোট-বড় অনেক রিসোর্ট আর কটেজ আছে। তবে দিনে পর্যটক সীমিত থাকায় রুমও দ্রুত শেষ হয়, তাই জাহাজের টিকিটের সাথে সাথেই রুম বুক করুন। দ্বীপে বিদ্যুৎ মূলত সৌর আর জেনারেটরে চলে, তাই রুমে কখন বিদ্যুৎ থাকবে জেনে নিন। সাধারণ কটেজ ৳২,০০০–৪,০০০, ভালো রিসোর্ট ৳৫,০০০–১২,০০০।

খরচের হিসাব

কক্সবাজার থেকে ২ দিন ১ রাত, জনপ্রতি (৪ জনের দল):

খাতআনুমানিক খরচ
জাহাজ (আসা-যাওয়া)২,০০০–৫,০০০৳
এক রাত কটেজ বা রিসোর্ট (ভাগাভাগি)৫০০–৩,০০০৳
খাওয়া (২ দিন)১,২০০–২,৫০০৳
সাইকেল/ভ্যান, ছেঁড়াদ্বীপের নৌকা৩০০–৮০০৳
মোট (ঢাকা-কক্সবাজার যাতায়াত ছাড়া)৪,০০০–১১,৩০০৳

সাথে কী নেবেন

  • জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম নিবন্ধন আর ট্রাভেল পাসের প্রিন্ট
  • নগদ টাকা; দ্বীপে এটিএম আর মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ওপর পুরো ভরসা করবেন না
  • সানস্ক্রিন, টুপি, সানগ্লাস
  • পুনর্ব্যবহারযোগ্য পানির বোতল আর ময়লার ব্যাগ
  • সমুদ্রপীড়ার ওষুধ (সাগর উত্তাল থাকলে জাহাজ দোলে)
  • পাওয়ার ব্যাংক

প্রশ্নোত্তর

সেন্টমার্টিন কখন যাওয়া যায়?

আগের মৌসুমগুলোর সরকারি নিয়ম অনুযায়ী নভেম্বরে শুধু দিনে যাওয়া যায়, ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে রাতে থাকা যায়, আর ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যটকদের যাওয়া বন্ধ। প্রতি মৌসুমে নিয়ম নতুন করে ঘোষণা হয়, তাই যাওয়ার আগে দেখে নিন।

সেন্টমার্টিন যেতে কি নিবন্ধন লাগে?

হ্যাঁ, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের নির্ধারিত ব্যবস্থায় অনলাইনে নিবন্ধন করে কিউআর কোডসহ ট্রাভেল পাস নিতে হয়। পাস ছাড়া জাহাজে ওঠা যায় না।

সেন্টমার্টিনের জাহাজ কোথা থেকে ছাড়ে?

আগের মৌসুমগুলোয় জাহাজ ছেড়েছে কক্সবাজার শহরের নুনিয়াছড়া ঘাট থেকে; টেকনাফ রুট নিরাপত্তার কারণে বন্ধ ছিল। এ বছরের রুট যাওয়ার আগে জেনে নিন।

সেন্টমার্টিন যেতে কত খরচ হয়?

কক্সবাজার থেকে ২ দিন ১ রাতের ট্রিপে জাহাজ, থাকা আর খাওয়া মিলিয়ে জনপ্রতি মোটামুটি ৪,০০০ থেকে ১১,০০০ টাকা, ঢাকা-কক্সবাজার যাতায়াত আলাদা।

সেন্টমার্টিনে কি বারবিকিউ করা যায়?

না। প্রবাল আর সামুদ্রিক প্রাণী রক্ষায় সৈকতে বারবিকিউ, আগুন জ্বালানো আর রাতে আলো-শব্দ নিষেধ।

ম্যাপে দেখুন, প্ল্যান করুন

জায়গাগুলোর বিস্তারিত, যাওয়ার উপায় আর খরচ দেখুন, আর নিজের ট্রিপ সাজান।