ট্রিপ প্ল্যান

পুরান ঢাকা এক দিনে: ঢাকেশ্বরী মন্দির কীভাবে যাবেন, লালবাগ, আহসান মঞ্জিল ও খাবার

ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে সদরঘাটের নৌকা পর্যন্ত এক দিনের হাঁটা-রিকশার রুট। মেট্রোরেলে কোন স্টেশনে নামবেন, কোন জায়গা কবে বন্ধ, লালবাগ কেল্লা-তারা মসজিদ-আর্মেনিয়ান চার্চ-আহসান মঞ্জিলের ইতিহাস, কোথায় বিরিয়ানি খাবেন আর খরচ।

Unseen Bangladesh ডেস্ক২২ অক্টোবর ২০২৬ · ৯ মিনিটে পড়া English
পুরান ঢাকা এক দিনে: ঢাকেশ্বরী মন্দির কীভাবে যাবেন, লালবাগ, আহসান মঞ্জিল ও খাবার
ছবি: Mahbub Hossain Shaheed (mahosha), CC BY-SA 4.0

ট্রিপ টিকেট

কত সময়
পুরো এক দিন (সকাল ৯টা–সন্ধ্যা ৭টা)
কীভাবে ঘুরবেন
রিকশা আর হাঁটা
কাছের মেট্রো স্টেশন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
খরচ
জনপ্রতি ৮০০–১,৫০০৳ (খাবারসহ)
সাপ্তাহিক বন্ধ
লালবাগ রবিবার, আহসান মঞ্জিল বৃহস্পতিবার

চারশো বছরের পুরনো শহরটা এখনো বেঁচে আছে সরু গলি, রিকশার ঘণ্টি আর বিরিয়ানির গন্ধে। মুঘল দুর্গ, নবাবের প্রাসাদ, আঠারো শতকের গির্জা, চীনামাটির তারায় সাজানো মসজিদ আর শহরের নামের সাথে জড়িয়ে থাকা ঢাকেশ্বরী মন্দির, সব এক-দেড় কিলোমিটারের মধ্যে। এক দিনে রিকশা আর হাঁটায় পুরান ঢাকার সেরা জায়গাগুলো কীভাবে দেখবেন, কোনটা কবে বন্ধ, কোথায় কী খাবেন, সব এই গাইডে।

শুরুর আগে: কবে যাবেন

পুরান ঢাকার দুই প্রধান জাদুঘর দুই দিন বন্ধ থাকে, তাই দিন বাছাই জরুরি।

জায়গাসাপ্তাহিক বন্ধমনে রাখুন
লালবাগ কেল্লারবিবারশুক্রবার জুমার সময় কিছুক্ষণ বন্ধ
আহসান মঞ্জিলবৃহস্পতিবারশুক্রবার বিকেলে খোলে
ঢাকেশ্বরী মন্দিরখোলা প্রতিদিনপূজার সময় ভিড় অনেক
তারা মসজিদখোলা প্রতিদিননামাজের সময় পর্যটক প্রবেশ সীমিত
আর্মেনিয়ান চার্চসাধারণত খোলাগেটে তত্ত্বাবধায়ককে বলে ঢুকতে হয়

সেরা দিন: শনিবার বা সোমবার থেকে বুধবার। শুক্রবার সকালে রাস্তা ফাঁকা থাকে, কিন্তু জুমার সময় অনেক জায়গা বন্ধ থাকে। জাদুঘরের সময়সূচি আর টিকিটের দাম মাঝে মাঝে বদলায়, যাওয়ার আগে একবার দেখে নিন।

ঢাকেশ্বরী মন্দির কীভাবে যাবেন

ঢাকেশ্বরী মন্দির পলাশী-বকশীবাজার এলাকায়, লালবাগ কেল্লা থেকে এক কিলোমিটারেরও কম দূরে। তাই দিনটা এখান থেকে শুরু করাই সবচেয়ে সুবিধাজনক।

  • মেট্রোরেলে: উত্তরা বা মিরপুর থেকে মেট্রোরেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনে নামুন। সেখান থেকে রিকশায় পলাশী হয়ে ঢাকেশ্বরী ১০–১৫ মিনিট, ভাড়া ৫০–৮০৳।
  • বাসে: শাহবাগ, নীলক্ষেত বা আজিমপুরগামী বাসে নেমে রিকশা নিন। নীলক্ষেত থেকে রিকশায় ৫–১০ মিনিট।
  • রিকশাওয়ালাকে কী বলবেন: "ঢাকেশ্বরী মন্দির, পলাশী হয়ে" বললেই চেনেন। কাছের পরিচিত জায়গা বুয়েট আর পলাশী মোড়।
  • উবার বা পাঠাও: গন্তব্য "Dhakeshwari Temple" দিলেই হবে, তবে মন্দিরের সামনের গলি সরু; বড় রাস্তায় নেমে হাঁটুন।
ঢাকেশ্বরী মন্দির
ঢাকেশ্বরী মন্দিরছবি: Ishrat jahan, CC BY-SA 3.0

ঢাকেশ্বরী মন্দিরের ইতিহাস

ঢাকেশ্বরী দেশের জাতীয় মন্দির এবং ঢাকার সবচেয়ে প্রাচীন মন্দিরগুলোর একটি। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী বারো শতকে সেন রাজবংশের রাজা বল্লাল সেন এটি প্রতিষ্ঠা করেন, যদিও এখনকার ভবনগুলো পরে বিভিন্ন সময়ে তৈরি ও সংস্কার করা। "ঢাকেশ্বরী" মানে ঢাকার দেবী, আর অনেকের মতে শহরের নাম "ঢাকা" এসেছে এই নাম থেকেই।

মন্দির চত্বরে মূল মন্দির, চারটি শিবমন্দির আর একটি পুকুর আছে। দুর্গাপূজার সময় এখানে দেশের সবচেয়ে বড় আয়োজনগুলোর একটি হয়। মন্দিরে ঢুকতে কোনো টিকিট লাগে না। জুতা বাইরে খুলে রাখুন, শালীন পোশাক পরুন আর পূজার সময় ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন।

এক দিনের রুট

পুরো রুটটা মোটামুটি পশ্চিম থেকে পূর্বে, লালবাগ থেকে বুড়িগঙ্গার পাড়ে নেমে আসা।

সকাল ৯টা: ঢাকেশ্বরী মন্দির

সকালের দিকে মন্দির শান্ত থাকে, প্রার্থনার ঘণ্টা আর ধূপের গন্ধে পরিবেশটা আলাদা। আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা সময় রাখুন।

সকাল ১০টা: লালবাগ কেল্লা

১৬৭৮ সালে মুঘল শাহজাদা আজম শাহ এই দুর্গের কাজ শুরু করেন, পরে সুবেদার শায়েস্তা খান কাজ চালান। কিন্তু শায়েস্তা খানের মেয়ে পরী বিবির মৃত্যুর পর কাজ আর শেষ হয়নি; তাই লালবাগ একটা অসমাপ্ত দুর্গ। ভেতরে পরী বিবির মাজার, দরবার হল ও হাম্মামখানা (এখন জাদুঘর) আর তিন গম্বুজের মসজিদ। সবুজ লন আর লাল দেয়ালের মাঝে হাঁটতে দেড়-দুই ঘণ্টা লেগে যায়।

লালবাগ কেল্লা
লালবাগ কেল্লাছবি: Farha Fawzia Atashi, CC BY-SA 4.0

দুপুর ১২:৩০: দুপুরের খাবার

লালবাগ থেকে রিকশায় নাজিরাবাজার বা বেচারাম দেউড়ির দিকে যান। পুরান ঢাকার বিখ্যাত বিরিয়ানি, মোরগ পোলাও আর কাচ্চির দোকানগুলো এদিকেই। দুপুরের পরপর অনেক দোকানে খাবার শেষ হয়ে যায়, তাই দেরি করবেন না।

দুপুর ২টা: তারা মসজিদ আর আর্মেনিয়ান চার্চ

দুটোই আরমানিটোলায়, একটা থেকে আরেকটা হেঁটে পাঁচ মিনিট।

  • তারা মসজিদ: আঠারো শতকের মসজিদ, পরে চীনা ও জাপানি চীনামাটির টুকরো দিয়ে সাদা দেয়ালে নীল তারার নকশা করা হয়। নামাজের সময় বাদ দিয়ে যান, আর ভেতরে ঢোকার আগে মাথা ঢেকে নিন।
  • আর্মেনিয়ান চার্চ (১৭৮১): একসময় ঢাকায় বড় আর্মেনিয়ান ব্যবসায়ী সম্প্রদায় ছিল; আরমানিটোলা নামটাও তাদের থেকেই। গির্জা চত্বরের পুরনো সমাধিফলকগুলোয় সেই ইতিহাস লেখা।
তারা মসজিদ
তারা মসজিদছবি: Dead.rabbit, CC BY-SA 4.0

বিকেল ৩:৩০: আহসান মঞ্জিল

বুড়িগঙ্গার তীরে ঢাকার নবাবদের গোলাপি প্রাসাদ, এখন জাতীয় জাদুঘরের অংশ। গম্বুজওয়ালা এই ভবন উনিশ শতকে নবাব আবদুল গনি তৈরি করান। ভেতরে নবাবি আমলের আসবাব, ছবি আর দরবার হল। নদীর দিকের বড় সিঁড়িটা ছবির জন্য সেরা জায়গা।

বিকেল ৫টা: শাঁখারীবাজার আর সদরঘাট

আহসান মঞ্জিল থেকে হেঁটে শাঁখারীবাজার, শত বছরের শাঁখা তৈরির কারিগরদের সরু গলি। গলির দুই পাশে পুরনো, গায়ে গা লাগানো বাড়ি আর শাঁখা-সিঁদুরের দোকান। তারপর সদরঘাটে গিয়ে নৌকায় বুড়িগঙ্গায় আধা ঘণ্টা ঘুরুন; বিকেলের আলোয় নদী থেকে আহসান মঞ্জিল আর লঞ্চঘাটের দৃশ্য দারুণ।

কাজআনুমানিক খরচ
বুড়িগঙ্গায় নৌকা, আধা ঘণ্টা (পুরো নৌকা)১৫০–৩০০৳
রিকশা, প্রতিটি ছোট দূরত্ব৪০–১০০৳

সময় থাকলে আরও যা দেখবেন

  • হোসেনী দালান: শিয়া সম্প্রদায়ের ইমামবাড়া, মুহররমের সময় তাজিয়া মিছিল এখান থেকে শুরু হয়।
  • বড় কাটরা ও ছোট কাটরা: মুঘল আমলের সরাইখানার ধ্বংসাবশেষ, চকবাজারের কাছে।
  • বিউটি বোর্ডিং: বাংলাবাজারের পুরনো বাড়ি, একসময় কবি-লেখকদের আড্ডার জায়গা।
  • কার্জন হল ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়; মেট্রো স্টেশনের কাছে, শুরুতে বা শেষে দেখে নেওয়া যায়।

কী খাবেন

পুরান ঢাকার খাবার নিজেই একটা কারণ যাওয়ার।

  • বিরিয়ানি ও কাচ্চি: হাজীর বিরিয়ানি, নান্না মিয়ার মোরগ পোলাও আর আরও অনেক পুরনো দোকান।
  • বাকরখানি: লালবাগ-চকবাজারের তন্দুরে সকালে গরম বাকরখানি।
  • বোরহানি আর লাচ্ছি: বিরিয়ানির সাথে বোরহানি, বিকেলে লাচ্ছি আর ফালুদা।
  • রমজানে চকবাজারের ইফতার বাজার: রোজার মাসে গেলে "বড় বাপের পোলায় খায়" সহ নানা ইফতারি।

খরচের হিসাব

জনপ্রতি, এক দিনে:

খাতআনুমানিক খরচ
মেট্রো বা বাস (আসা-যাওয়া)৬০–২০০৳
রিকশা (সারাদিন, ভাগাভাগি)১৫০–৩০০৳
লালবাগ ও আহসান মঞ্জিলের টিকিট৫০–১০০৳ (বিদেশিদের বেশি)
দুপুরের খাবার ও নাস্তা৪০০–৭০০৳
নৌকা (ভাগাভাগি)৫০–১৫০৳
মোট৭১০–১,৪৫০৳

কিছু টিপস

  • আরামদায়ক জুতা পরুন; গলিগুলো সরু, অনেক জায়গায় হাঁটতেই হবে
  • মানিব্যাগ আর ফোন সাবধানে রাখুন, বিশেষ করে সদরঘাট ও ভিড়ের গলিতে
  • মসজিদ ও মন্দিরে শালীন পোশাক পরুন
  • গরমের দিনে পানি সাথে রাখুন; দুপুরে ছায়ায় বিশ্রাম নিন
  • কারিগর বা দোকানদারদের ছবি তোলার আগে জিজ্ঞেস করুন

ঢাকার অন্য দর্শনীয় স্থান যেমন সংসদ ভবন, জাতীয় জাদুঘর আর হাতিরঝিল নিয়ে দেখুন আমাদের ঢাকা জেলার গাইড। আর প্রতিটি জায়গার আলাদা পাতা আছে: লালবাগ কেল্লা, আহসান মঞ্জিল।

প্রশ্নোত্তর

ঢাকেশ্বরী মন্দির কিভাবে যাব?

মেট্রোরেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনে নেমে রিকশায় পলাশী হয়ে ১০–১৫ মিনিট। নীলক্ষেত বা আজিমপুর থেকেও রিকশায় সহজে যাওয়া যায়। মন্দিরটা বুয়েটের কাছে, লালবাগ কেল্লা থেকে এক কিলোমিটারের কম।

ঢাকেশ্বরী মন্দিরে ঢুকতে কি টিকিট লাগে?

না, মন্দিরে ঢুকতে কোনো টিকিট লাগে না। জুতা বাইরে রেখে ঢুকতে হয়।

লালবাগ কেল্লা কবে বন্ধ থাকে?

রবিবার পুরো দিন বন্ধ। শুক্রবার জুমার নামাজের সময় কিছুক্ষণ বন্ধ থাকে। সময়সূচি মৌসুমভেদে একটু বদলায়।

আহসান মঞ্জিল কবে বন্ধ?

বৃহস্পতিবার বন্ধ, শুক্রবার বিকেলে খোলে।

এক দিনে পুরান ঢাকার সব দেখা যায়?

মূল জায়গাগুলো, অর্থাৎ ঢাকেশ্বরী, লালবাগ, তারা মসজিদ, আর্মেনিয়ান চার্চ, আহসান মঞ্জিল আর সদরঘাট এক দিনে আরামে দেখা যায়। হোসেনী দালান বা কাটরা দেখতে চাইলে আরও কয়েক ঘণ্টা লাগবে।

ম্যাপে দেখুন, প্ল্যান করুন

জায়গাগুলোর বিস্তারিত, যাওয়ার উপায় আর খরচ দেখুন, আর নিজের ট্রিপ সাজান।