কলসকাঠী জমিদার বাড়ি, উপজেলা: বাকেরগঞ্জ, বরিশাল
ছবি: Sabbir Ahamed Rafi, পটুয়াখালী

উপজেলা: বাকেরগঞ্জ, বরিশাল · ঐতিহাসিক স্থান · লুকানো রত্ন

কলসকাঠী জমিদার বাড়ি

কলসকাঠী জমিদার বাড়ি বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ উপজেলার কলসকাঠী ইউনিয়নে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক জমিদারবাড়ি। প্রায় তিন শতাব্দীর পুরোনো এই জমিদারবাড়ি বরিশাল অঞ্চলের জমিদারি শাসন, স্থাপত্য ও সামাজিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। একসময় এখানে একই বংশের একাধিক জমিদারের বাড়ি ও স্থাপনা ছিল। কথিত আছে, কলসকাঠীতে ১৩ জন জমিদারের পৃথক বাড়ি ছিল। এ কারণে এলাকাটি “তের জমিদারের কলসকাঠী” নামেও পরিচিত। ইতিহাস: কলসকাঠীর জমিদারির ইতিহাসের সঙ্গে জানকী বল্লভ রায় চৌধুরীর নাম বিশেষভাবে জড়িত। তিনি গারুড়িয়ার জমিদার পরিবারের সন্তান ছিলেন। পারিবারিক বিরোধের কারণে তিনি গারুড়িয়া ছেড়ে চলে যান এবং পরবর্তীকালে আওরঙ্গপুর পরগনার জমিদারি লাভ করেন। আনুমানিক ১৭০০ সালের গোড়ার দিকে তিনি কলসকাঠীতে এসে বসতি স্থাপন করেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর বংশধরদের মধ্যে জমিদারি ভাগ হতে থাকে। এর ফলে কলসকাঠীতে একাধিক জমিদার পরিবার, বাড়ি, মন্দির ও অন্যান্য স্থাপনা গড়ে ওঠে। তাই কলসকাঠী জমিদার বাড়ি বলতে কেবল একটি ভবন নয়, বরং বিস্তৃত এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠা একটি জমিদারি জনপদ বোঝানো হয়। জমিদার বাড়ির স্থাপত্য: কলসকাঠীর জমিদার বাড়িগুলো তৎকালীন বাংলার জমিদারি স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য বহন করে। ইট, চুন-সুরকি ও পোড়ামাটির ব্যবহার ছিল স্থাপনাগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এখানে দোতলা আবাসিক ভবন, অন্দরমহল, প্রবেশপথ, মন্দির এবং জমিদার পরিবারের ব্যবহৃত বিভিন্ন স্থাপনা ছিল। বাড়িগুলোর দেয়াল, খিলান, দরজা-জানালা ও অলংকরণে পুরোনো স্থাপত্যরীতির ছাপ দেখা যায়। বর্তমানে অনেক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অবশিষ্ট অংশ দেখে অতীতের জমিদারবাড়িগুলোর আকার ও জাঁকজমক সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। শিক্ষা ও সামাজিক ক্ষেত্রে অবদান: কলসকাঠীর জমিদার পরিবার স্থানীয় শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নেও ভূমিকা রেখেছিল। তাদের উদ্যোগ ও সহযোগিতায় এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। কলসকাঠী বিএম একাডেমি এই এলাকার পুরোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গেও কলসকাঠীর নাম জড়িত। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে এই এলাকার মানুষ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৩০ সালের লবণ আইন অমান্য আন্দোলনেও কলসকাঠীর মানুষের অংশগ্রহণ ছিল। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি: ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধেও কলসকাঠী একটি বেদনাদায়ক ঘটনার সাক্ষী। ১৪ মে ১৯৭১ এলাকায় গণহত্যার ঘটনা ঘটে। এতে বহু নিরীহ মানুষ প্রাণ হারান। নিহতদের স্মরণে এলাকায় স্মৃতিচিহ্ন স্থাপন করা হয়েছে। ফলে জমিদারি ইতিহাসের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিও কলসকাঠীর ঐতিহাসিক গুরুত্ব বাড়িয়েছে। বর্তমান অবস্থা: দীর্ঘদিনের অযত্ন, প্রাকৃতিক ক্ষয় এবং যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে জমিদারবাড়ির অনেক অংশ বর্তমানে জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ। কোথাও দেয়াল ও পুরোনো ভবনের অংশ টিকে আছে, আবার অনেক স্থাপনা ইতোমধ্যে ধ্বংস হয়ে গেছে বা বিলুপ্তির পথে। তারপরও পুরোনো ভবন, মন্দির, স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ এবং চারপাশের পরিবেশ এখনো অতীতের জমিদারি যুগের স্মৃতি বহন করছে। ইতিহাস ও পুরাকীর্তিতে আগ্রহীদের কাছে তাই কলসকাঠী একটি আকর্ষণীয় স্থান। কেন ঘুরতে যাবেন? কলসকাঠী জমিদার বাড়িতে গেলে একই জায়গায় বরিশাল অঞ্চলের প্রায় তিনশ বছরের জমিদারি ইতিহাস, পুরোনো স্থাপত্য, মন্দির, শিক্ষা ও সামাজিক ইতিহাস, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়া যায়।

🗓️ যাওয়ার সেরা সময়অক্টোবর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত ঘোরার জন্য আরামদায়ক। দিনের হিসেবে সকাল ৮টা–১১টা অথবা বিকেল ৩টা–৫টা ভালো। নভেম্বরের দিকে ঐতিহ্যবাহী জগদ্ধাত্রী পূজার সময় গেলে এলাকাটি বেশ উৎসবমুখর থাকে, তবে তখন ভিড় বেশি।
⏱ কতক্ষণ লাগেজমিদার বাড়ি, পুরোনো মন্দির, পুকুর ও আশপাশের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো ভালোভাবে দেখতে সাধারণত ১–২ ঘণ্টা যথ
💰 খরচজমিদার বাড়ি দেখার জন্য বর্তমানে প্রচলিত কোনো নির্ধারিত প্রবেশমূল্য নেই। মূল খরচ হবে যাতায়াত ও খাবারের। স্থানীয় যানবাহনের ভাড়া দূরত্ব ও সময় অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে, তাই ওঠার আগে ভাড়া ঠিক করে নেওয়া ভালো।

কীভাবে যাবেন

প্রথমে বরিশাল শহর থেকে বাকেরগঞ্জ উপজেলা সদরে যেতে হবে। বাকেরগঞ্জ থেকে সাহেবগঞ্জ খেয়াঘাট পার হয়ে মোটরসাইকেল, অটোরিকশা, রিকশা বা ভ্যানে প্রায় ৩ কিলোমিটার গেলে কলসকাঠী বাজারের কিছুটা আগে জমিদার বাড়ি। এটি কলসকাঠী বাজারসংলগ্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাছাকাছি। স্থানীয় কাউকে “কলসকাঠী জমিদার বাড়ি” বললেই সহজে পথ দেখিয়ে দেবে।

কোথায় থাকবেন

কলসকাঠীতে পর্যটকদের জন্য ভালো মানের আবাসনের ব্যবস্থা সীমিত। কাছাকাছি থাকতে চাইলে Bakerganj Dak Bunglow বা Bakerganj Guest House বিবেচনা করা যায়। বেশি আরামদায়ক ও উন্নত আবাসনের জন্য বরিশাল শহরে থাকা ভালো; সেখানে Hotel Grand Park Barishal-এর মতো হোটেল রয়েছে।

কাছে খাবারের ব্যবস্থা

কলসকাঠী বাজারে সাধারণ চা, নাশতা ও স্থানীয় খাবারের দোকান পাওয়া যায়। তুলনামূলক ভালোভাবে খেতে চাইলে বাকেরগঞ্জ সদরে যেতে পারেন। সেখানে B River Cafe, শাওন খাবার ঘর ও জয় মিষ্টান্ন ভান্ডার-এর মতো খাবারের জায়গা রয়েছে।

সুবিধা

এটি আধুনিকভাবে পরিচালিত পর্যটনকেন্দ্র নয়। তাই গাইড, নির্দিষ্ট টিকিট কাউন্টার, পর্যটক তথ্যকেন্দ্র, উন্নত পাবলিক টয়লেট বা পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থার নিশ্চয়তা নেই। কাছের কলসকাঠী বাজার থেকে পানি, হালকা খাবার ও প্রয়োজনীয় সাধারণ জিনিস সংগ্রহ করা যায়। নিজের সঙ্গে পানির বোতল ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী রাখা ভালো।

কাছের দর্শনীয় স্থান

জমিদার বাড়ির একেবারে কাছেই কলসকাঠী শিব মন্দির দেখা যায়। বাকেরগঞ্জ এলাকায় সময় থাকলে পথ প্রদর্শিকা কুমারী মারিয়া গির্জা (পাদ্রীশিবপুর গির্জা), মুগা খান মসজিদ এবং নসরত গাজীর মসজিদ ঘুরে দেখা যেতে পারে।

নিরাপত্তা পরামর্শ

জমিদার বাড়ির অনেক অংশ জরাজীর্ণ ও ভঙ্গুর। ভাঙা দেয়াল, ছাদ, সিঁড়ি বা পরিত্যক্ত ভবনের ওপর ওঠা উচিত নয়। বর্ষাকালে মাটি ও ঘাটের অংশ পিচ্ছিল হতে পারে। সন্ধ্যার আগেই ঘোরাঘুরি শেষ করা সুবিধাজনক। ধর্মীয় স্থাপনা ও স্থানীয় বাসিন্দাদের ব্যক্তিগত জায়গায় প্রবেশের আগে অনুমতি নেওয়া উচিত।

আরও ছবি

কলসকাঠী জমিদার বাড়ি: ছবি ২
কলসকাঠী জমিদার বাড়ি: ছবি ৩
কলসকাঠী জমিদার বাড়ি: ছবি ৪
কলসকাঠী জমিদার বাড়ি: ছবি ৫
কলসকাঠী জমিদার বাড়ি: ছবি ৬
কলসকাঠী জমিদার বাড়ি: ছবি ৭
কলসকাঠী জমিদার বাড়ি: ছবি ৮
কলসকাঠী জমিদার বাড়ি: ছবি ৯
কলসকাঠী জমিদার বাড়ি: ছবি ১০

ম্যাপে অবস্থান

পাঠিয়েছেন Sabbir Ahamed Rafi, পটুয়াখালী · ২৩/১০/২০২৬। তথ্যগুলো একজন দর্শনার্থীর পাঠানো, যাওয়ার আগে স্থানীয়ভাবে যাচাই করে নিন।

Unseen Bangladesh অ্যাপে খুলুন →

বরিশাল জেলার আরও লুকানো রত্ন

বরিশাল জেলার ভ্রমণ গাইড: সব দর্শনীয় স্থান →